ইয়াহুদী-নাসারাদেরকে অনুসরণ করলে তারা তোমাদেরকে কাফির বানিয়ে ছাড়বে

يَااَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ اُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ اِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ
“হে ঈমানদারগণ! যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তোমরা যদি তাদের দলের আনুগত্য করো, তাহলে তারা তোমাদেরকে ঈমানের পর আবার অবিশ্বাসী (কাফিরে) পরিণত করে ছাড়বে”।

[সূরা ইমরান-৩, আয়াতঃ ১০০]

এ আয়াতে মু‘মিনদেরকে ইয়াহুদীদের কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করার প্রতি সতর্ক করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আয়াতে তাদের প্রতারণা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার উপর সতর্ক করা হয়েছিলো। মু‘মিনদেরকে একথার উপর সতর্ক করা হয়েছে যে, ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে তাদের পবিত্র ধর্ম ইসলাম থেকে বিচ্যুত করে দেয়া। [জালালাইন (বাংলা অনুবাদ) ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৮৮]

ইয়াহুদীদের চক্রান্ত ও প্রতারণা এবং তাদের পক্ষ হতে মুসলিমদের ভ্রষ্ট করার নিকৃষ্টতম প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করার পর মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরাও তাদের কূট-চক্রান্তের ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকবে। সাবধান! কুরআন তিলাওয়াত এবং রাসূল -এর বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তোমরা যেন তাদের জালে ফেঁসে না যাও। [আহসানুল বায়ান]

এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মু‘মিনদেরকে সাবধান করছেন যে, তারা যেন আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী ও নাসারাদের আনুগত্য না করে। কেননা তারা মু‘মিনদেরকে আল্লাহ তা‘আলা যে নবী ও কিতাবের নেয়ামত প্রদান করেছেন সেটার হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে, কারণ তাদের অনুসরণ করলে তারা মু‘মিনদেরকে কাফের বানিয়ে ছাড়বে। অন্য আয়াতেও আল্লাহ তা‘আলা সেটা ঘোষণা করেছেন। যেমন- “কিতাবীদের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে তোমাদের ঈমান আনার পর কাফিররূপে ফিরিয়ে নিতে পারতো। সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তাদের নিজেদের পক্ষ থেকে বিদ্বেষবশতঃ (তারা এটা করে থাকে)”। [সূরা বাক্বারাহ-২, আয়াতঃ ১০৯]

ইবনু জারীর ত্বারাবী [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারগণ একাধিক মত পোষণ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন, এ আয়াতে উল্লিখিত এর অর্থ হচ্ছে, ‘হে আউস ও খাযরাজ গোত্রীয় মু‘মিনগণ’। আর এর অর্থ হচ্ছে, শা‘স ইবনু কায়স নামক ইয়াহুদী।

সুদ্দী [রাহিমাহুল্লাহ] অত্র আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বলেন, এ আয়াতটি ছা‘লাবাতু ইবনু আনামাতুল আনসারী সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। তার ও অন্য একজন আনসারীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছিলো। তাদের পাশ দিয়ে বানূ কায়নুকার একজন ইয়াহুদী যাচ্ছিলো। সে পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। ফলে দু’টি গোত্র যথা আউস ও খাযরাজ উত্তেজিত হয়ে উঠলো, অস্ত্র ধারণ করলো এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়লো। তখন আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াত অবতীর্ণ করেন। অত্র আয়াতে বলা হয়, যদি তোমরা অস্ত্র ধারণ কর, যুদ্ধ কর, হানাহানি কর, তাহলে তোমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে অকৃতজ্ঞ বলে গণ্য হবে। [ত্বাবারী (বাংলা অনুবাদ) ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩]

মুজাহিদ [রাহিমাহুল্লাহ] আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, আনসারদের গোত্রসমূহ বড় দু’টি গোত্রে বিভক্ত ছিলো, আউস ও খাযরাজ। আর এ দু’টি বড় গোত্রে অন্ধকার যুগ থেকে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। তারা একে অপরকে নিজেদের শত্রু মনে করতো। তারপর আল্লাহ তা‘আলা ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ -এর মাধ্যমে তাদের উপরে দয়া ও ইহসান প্রদর্শন করলেন। তাদের মধ্যে যে যুদ্ধের অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলছিলো, তা তিনি নির্বাপিত করলেন এবং তাদেরকে সুশীতল ইসলামের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। বর্ণনাকারী আরো বলেন, একদিন আউস সম্প্রদায়ের একজন লোক খাযরাজ সম্প্রদায়ের অপর একজন লোকের সাথে বসে বসে আলাপ করতে লাগলো। তাদের সাথে উপবিষ্ট ছিল একজন ইয়াহুদী। সে তাদেরকে তাদের পূর্বকার যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলো এবং তাদের মধ্যে যে তিক্ত শত্রুতা অতীতে বিদ্যমান ছিল, তার দিকেও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগলো। ফলে তারা উভয়ে উত্তেজিত হয়ে একজন অপরজনকে গালিগালাজ করতে লাগলো ও পরে হাতাহাতি করতে লাগলো। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর একজন তার গোত্রের লোকদেরকে এবং অপরজনও নিজ গোত্রের লোকদেরকে ডাকাডাকি করতে লাগলো। উভয় গোত্র তখন হাতিয়ার নিয়ে বের হয়ে পড়লো এবং এক গোত্র অন্য গোত্রের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দণ্ডায়মান হলো। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ তখন মদীনায় অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনার খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ ঘটনাস্থলে তাশরীফ আনলেন এবং উভয় দলকে শান্ত করার জন্যে চেষ্টা করতে লাগলেন। তারপর তারা রাসূলুল্লাহ -এর চেষ্টায় মাঠ থেকে প্রত্যাবর্তন করলো এবং নিজেদেরকে নিরস্ত্র করলো। আল্লাহ তা‘আলা এ ঘটনার প্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল করলেন। সুতরাং অত্র আয়াতের ব্যাখ্যা হবে, “হে ঐসকল ব্যক্তিবর্গ! যারা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর তরফ থেকে তাদের নবীগণ যা কিছু নিয়ে এসেছেন সে সম্পর্কে অন্তরে বিশ্বাস রাখে ও মুখে স্বীকার করে, তোমরা যদি এমন একটি দলের অনুসরণ করো, যারা কিতাবী এবং আল্লাহর কিতাব কুরআনুল কারীমের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে, আর তারা তোমাদের যা আদেশ করে তা তোমরা গ্রহণ করো; তাহলে তারা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং আল্লাহ তা‘আলার রাসূলের প্রতি তোমাদের বিশ্বাস স্থাপন ও তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে আল্লাহর রাসূল যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি তোমাদের স্বীকৃতি জ্ঞাপনের পর তোমাদেরকে পুনরায় কাফিরে পরিণত করবে। আলোচ্য আয়াতে উল্লিখিত كَافِرِينَ শব্দটির অর্থ হচ্ছে جَاحِدُون অর্থাৎ ‘তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে রাসূল যে সত্য নিয়ে এসেছেন তা সত্য বলে গণ্য করার পর অন্য কথায় ঈমান আনয়নের পর তোমরা তো পুনরায় অস্বীকার করবে। সুতরাং মহান আল্লাহ তা‘আলা মু‘মিন বান্দাদেরকে কাফিরদের থেকে নসীহত ও পরামর্শ গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা নিঃসন্দেহে তোমাদের বিরুদ্ধে হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা ও শঠতার আশ্রয় নিয়েছে। [ত্বাবারী (বাংলা অনুবাদ) ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩-১২৪]

ক্বাতাদাহ [রাহিমাহুল্লাহ] আলোচ্য আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, এর অর্থ হচ্ছে– আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে তাদের মধ্যে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যেহেতু তোমরা আল্লাহ তা‘আলার কালাম মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করে থাকো, সেহেতু আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং তাদের পথভ্রষ্টতা সম্বন্ধে তোমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা তাদেরকে তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে বিশ্বাস করো না এবং তোমরা তোমাদের নিজস্ব অভিমতের বিরুদ্ধে তাদের নসীহত গ্রহণ করো না। কেননা, তারা তোমাদের পথভ্রষ্টকারী ও হিংসুটে দুশমন। বস্তুত তোমরা এমন সম্প্রদায়কে কেমন করে বিশ্বাস করতে পারো যারা নিজেদের কিতাবকে অস্বীকার করেছে, পয়গাম্বারদেরকে (নবীদেরকে) হত্যা করেছে, তাদের নিজ কর্ম সম্পর্কে তারা বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে এবং তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে অক্ষম বলে পরিগণিত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার শপথ, তারাই অভিযুক্ত দুশমন। [ত্বাবারী (বাংলা অনুবাদ) ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৪]

No comments

Theme images by Blogger. Powered by Blogger.