আল্লাহ যেভাবে দু‘আ করার আদব শিক্ষা দিয়েছেন
اُدْعُوا
رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً اِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
“তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের রবকে
ডাকো; নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না”।
[সুরা আ‘রাফ-৭, আয়াতঃ ৫৫]
তাফসীর ইবনু কাসীর
আল্লাহ তা‘আলা স্বীয়
বান্দাদেরকে প্রার্থনা করার নিয়ম-নীতি শিক্ষা দিচ্ছেন, যা তাদের জন্যে দ্বীন ও দুনিয়ায়
মুক্তি লাভের কারণ। তিনি বলেন, ‘তোমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ও সঙ্গোপনে তোমাদের
প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করো’। যেমন তিনি বলেন, ‘প্রভুকে স্বীয় অন্তরে স্মরণ করো’।
জনগণ উচ্চস্বরে প্রার্থনা করতে শুরু করে দিয়েছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের নফসের
উপর দয়া কর। তোমরা কোন বধির ও অনুপস্থিত সত্ত্বাকে ডাকছো না। তোমরা যাঁর নিকট প্রার্থনা
করছো তিনি নিকটেই রয়েছেন এবং সবকিছু শুনছেন’। অত্যন্ত কাকুতি মিনতি এবং অনুনয় বিনয়ের
সাথে দু‘আ করবে। খুবই নত হয়ে সঙ্গোপনে প্রার্থনা জানাবে এবং আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি
পূর্ণ বিশ্বাস রাখবে। বাগাড়ম্বর করে উচ্চস্বরে দু‘আ করা উচিত নয়। রিয়াকারী থেকে বাঁচবার
জন্যে পূর্বকালের লোকেরা কুরআনের হাফিয হওয়া সত্ত্বেও জনগণ ঘূর্ণাক্ষরেও তাঁদের হাফিয
হওয়ার কথা জানতে পারতো না। তাঁরা রাত্রে নিজ নিজ ঘরে দীর্ঘক্ষণ ধরে স্বলাত/নামায পড়তেন
এবং তাঁদের ঘরে মেহমান থাকতো; অথচ তারা তাঁদের স্বলাতের/নামাযের টেরই পেতো না। কিন্তু
আজকাল আমরা এ ধরনের লোক দেখতে পাই যে, সঙ্গোপনে ইবাদত করার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও
তারা সদা-সর্বদা প্রকাশ্যভাবে ইবাদত করে থাকে। পূর্ব যুগের মুসলমানরা যখন দু‘আ করতেন,
তখন শুধু ফিস্ফিস শব্দ ছাড়া তাঁদের মুখ থেকে কোন শব্দ শোনা যেতো না। কেননা আল্লাহ
তা‘আলা বলেন, “তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রভুকে ডাকো”। আল্লাহ তা‘আলা
তাঁর এক মনোনীত বান্দার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, যখন সে স্বীয় প্রভুকে ডাকতো, তখন খুবই উচ্চস্বরে
ডাকতো। শব্দকে উচ্চ করা অত্যন্ত অপছন্দনীয়। ইবনু আব্বাস [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] اِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ-এর তাফসীরে বলেন, এর ভাবার্থ হচ্ছে– ‘প্রার্থনায় সীমালঙ্ঘনকে আল্লাহ
তা‘আলা পছন্দ করেন না’। আবূ মুজলিয [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, ‘তোমরা নবীদের পদ মর্যাদা
লাভ করার জন্যে দু‘আ করো না’। [ইবনু কাসীর ৮-১১তম খন্ড (বাংলা অনুবাদ), পৃষ্ঠা ৩১১-৩১২]
সা‘দ [রাহিমাহুল্লাহ]
স্বীয় পুত্রকে দেখেন যে সে প্রার্থনা করছে, ‘হে আল্লাহ! আমি জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামতরাজি
এবং সেখানকার রেশমী বস্ত্রের জন্যে প্রার্থনা করছি, আর জাহান্নাম হতে, জাহান্নামের
শৃঙ্খল ও বেড়ি হতে আশ্রয় চাচ্ছি’। তখন তিনি পুত্রকে বলেন, ‘হে বৎস! আমি রাসূলুল্লাহ
ﷺ-কে বলতে শুনেছি,
‘নিকটবর্তী জামানায় এমন লোক সৃষ্ট হবে যারা প্রার্থনা করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করবে এবং
অযু করার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করবে’। অতঃপর তিনি (উদ্ঊ- রব্বাকুম
তাদ্বার্রু‘আও ওয়া খুফ্ইয়াহ) এই আয়াতটি পাঠ করেন। হে আমার পুত্র! তোমার জন্যে তো
শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত এবং জান্নাতের নিকটবর্তীকারি
কথা ও কাজের জন্যে প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নাম হতে ও জাহান্নামের নিকটবর্তীকারী কথা
ও কাজ হতে আশ্রয় চাচ্ছি’। [ইবনু কাসীর ৮-১১তম খন্ড (বাংলা অনুবাদ), পৃষ্ঠা ৩১১-৩১২]
তাফসীর জালালাইন
আরবী ভাষায় دُعَا শব্দটির অর্থ দ্বিবিধ। (১) বিপদাপদ দূরীকরণ
ও অভাব পূরণের জন্য কাউকে ডাকা এবং (২) যে কোন অবস্থায় কাউকে স্মরণ করা। এ আয়াতে উভয়
অর্থই হতে পারে। বলা হয়েছে– اُدْعُوا رَبَّكُمْ অর্থাৎ, অভাব পূরণের জন্য স্বীয় পালনকর্তাকে
ডাকো অথবা স্মরণ করো এবং পালনকর্তার ইবাদত কর।
প্রথমাবস্থায় অর্থ হবে, স্বীয় অভাব-অনটন একমাত্র আল্লাহর কাছেই ব্যক্ত করো।
আর দ্বিতীয় অবস্থায় অর্থ হবে, স্মরণ ও ইবাদত একমাত্র তাঁরই করো। উভয় তাফসীরই পূর্ববর্তী
মনীষী ও তাফসীরবিদদের কাছ থেকে বর্ণিত রয়েছে।
এরপর বলা হচ্ছে – تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً অর্থাৎ ‘বিনীতভাবে ও গোপনে’। تَضَرُّ শব্দের অর্থ- অক্ষমতা, বিনয় ও নম্রতা
প্রকাশ করা এবং خُفْيَةً
শব্দের অর্থ- গোপন। এ দু’টি শব্দে দু‘আ ও স্মরণের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ
আদব বর্ণিত হয়েছে। প্রথমত অপারগতা ও অক্ষমতা এবং বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে দু‘আ করা,
এটা কবুল হওয়ার জন্য জরুরি শর্ত। দু‘আর ভাষাও অক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বলার ভঙ্গি এবং দু‘আর আকার-আকৃতিও বিনয় ও নম্রতাসূচক হওয়া চাই। এতে বুঝা যায় যে, আজকাল
জনসাধারণ যে ভঙ্গিতে দু‘আ প্রার্থনা করে, প্রথমত একে দু‘আ-প্রার্থনা বলাই যায় না; বরং
দু‘আ পাঠ করা বলা উচিৎ। কেননা, প্রায়ই জানা থাকে না যে, মুখে যেসব শব্দ উচ্চারণ করা
হচ্ছে, সেগুলোর অর্থ কি? আজকাল সাধারণ মসজিদসমূহে এটি ইমামদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
তাদের কতিপয় আরবি বাক্য মুখস্থ থাকে এবং স্বালাত/নামায শেষে সেগুলোই আবৃত্তি করা হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বয়ং ইমামদেরও এসব শব্দের অর্থ জানা থাকে না। তাদের জানা থাকলেও
মুক্তাদীরা সে সম্পরকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। তারা অর্থ না বুঝেই ইমামের আবৃত্তি করা
বাক্যাবলির সাথে সাথে ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলতে থাকে। এই আগাগোড়া প্রহসনের সারমর্ম কতিপয়
বাক্যের আবৃত্তি ছাড়া কিছুই নয়। দু‘আ প্রার্থনার যে স্বরূপ, তা এক্ষেত্রে পাওয়া যায়
না। এটা ভিন্ন কথা যে, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় কৃপায় এসব নিষ্প্রাণ বাক্যগুলোও কবুল করে
নিতে পারেন। কিন্তু একথা বুঝা দরকার যে, দু‘আ প্রার্থনার বিষয়, পাঠ করার বিষয় নয়। কাজেই
চাওয়ার যথার্থ রীতি অনুযায়ীই চাইতে হবে।
এছারা যদি কারো নিজের
উচ্চারিত বাক্যাবলির অর্থও জানা থাকে এবং তা বুঝেসুঝে বলে, তবে বলার ভঙ্গি এবং বাহ্যিক
আকার-আকৃতিতে বিনয় ও নম্রতা ফুটে না উঠলে এ দু‘আও দাবিতে পরিণত হয়; যা করার অধিকার
কোন বান্দারই নেই।
মোটকথা, প্রথম শব্দে
দু‘আর প্রাণ এরূপ ব্যক্ত হয়েছে যে, স্বীয় অক্ষমতা, দীনতাহীনতা এবং বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ
করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে অভাব-অনটন ব্যক্ত করা। দ্বিতীয় শব্দে আর একটি নির্দেশ রয়েছে
যে, চুপিচুপি ও সঙ্গোপনে দু‘আ করা। এটাই উত্তম এবং কবুলের নিকটবর্তী। কারণ উচ্চস্বরে
দু‘আ চাওয়ার মধ্যে প্রথমত বিনয় ও নম্রতা বিদ্যমান থাকা কঠিন। দ্বিতীয়ত, এতে রিয়া ও
সুখ্যাতির আকাঙ্ক্ষা থাকার আশঙ্কাও রয়েছে। তৃতীয়ত, এতে প্রকাশ পায় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি
একথা জানে না যে, আল্লাহ তা‘আলা সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবই
তিনি জানেন এবং সরব (উচ্চস্বর) ও নীরব সব কথাই তিনি শোনেন। এ কারণেই খয়বর যুদ্ধের সময়
দু‘আ করতে গিয়ে সাহাবায়ে কিরামের আওয়াজ উচ্চ হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তোমরা কোন বধিরকে অথবা অনুপস্থিতকে
সত্ত্বাকে ডাকাডাকি করছো না যে, এত জোরে বলতে হবে; বরং একজন শ্রবণকারী ও দর্শনকারী
সত্ত্বাকে সম্বোধন করছো”। [বুখারী ৬৬১০, অধ্যায়ঃ তাক্বদীর; মুসলিম ৬৭৫৫/২৭০৪, অধ্যায়ঃ যিকির, দু‘আ,
তাওবাহ ও ক্ষমা প্রার্থনা]
অনুরূপভাবে, আল্লাহ
তা‘আলা জনৈক নবীর দু‘আ উল্লেখ করে বলেন, اِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا অৰ্থাৎ “যখন তিনি তার পালনকর্তাকে অনুচ্চস্বরে ডাকলেন”। [সূরা মারইয়াম-১৯, আয়াতঃ ৩] এতে বুঝ গেল যে, অনুচ্চস্বরে দু‘আ করা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দ।
পূর্ববর্তী মনীষীবৃন্দ অধিকাংশ সময় আল্লাহর স্মরণে ও দু‘আয় মশগুল থাকতেন, কিন্তু
কেউ তাদের আওয়াজ শুনতে পেত না। বরং তাদের দু‘আ তাদের ও আল্লাহর মধ্যে সীমিত থাকত।
তাদের অনেকেই সমগ্র কুরআন মুখস্থ তিলাওয়াত করতেন; কিন্তু অন্য কেউ টেরও পেত না। অনেকেই
প্রভূত দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করতেন; কিন্তু মানুষের কাছে তা প্রকাশ করে বেড়াতেন না।
অনেকেই রাতের বেলায় স্বগৃহে দীর্ঘ সময় সালাত আদায় করতেন; কিন্তু আগন্তুকরা তা বুঝতেই
পারতো না। হাসান বাসরী [রাহিমাহুল্লাহ] আরো বলেন, ‘আমি এমন অনেককে দেখেছি, যার গোপনে
সম্পাদন করার মত কোন ইবাদাত কখনো প্রকাশ্যে করেন নি। দু‘আয় তাদের আওয়াজ অত্যন্ত অনুচ্চ
হতো’। ইবনু জুরাইজ [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, ‘দু‘আয় আওয়াজকে উচ্চ করা এবং শোরগোল করা
মাকরূহ’। [ইবনু কাসীর] আবূ বকর জাসসাস [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, ‘এ আয়াত থেকে জানা যায়
যে, নীরবে দু‘আ করা জোরে দু‘আ করার চাইতে উত্তম। এমনকি আয়াতে যদি দু‘আর অর্থ যিকর
ও ইবাদাত নেয়া হয়, তবে এ সম্পর্কেও পূর্ববর্তী মনীষীদের সুনিশ্চিত অভিমত এই যে, নীরবে
যিকর সরব (উচ্চস্বরে) যিকর অপেক্ষা উত্তম’।
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে–
اِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ অর্থাৎ, ‘তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না’। مُعْتَدِينَ শব্দটি اعْتِداء থেকে উদ্ভুত। এর অর্থ- সীমা অতিক্রম
করা। উদ্দেশ্য এই যে, আল্লাহ তা‘আলা সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না। তা দু‘আয়
সীমা অতিক্রম করাই হোক কিংবা অন্য কোন কাজে; কোনটিই আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। চিন্তা
করলে দেখা যাবে যে, সীমা ও শর্তাবলী পালন ও আনুগত্যের নামই ইসলাম। স্বালাত, সিয়াম,
হজ্জ, যাকাত ও অন্যান্য লেনদেনে শরী‘আতের সীমা অতিক্রম করলে সেগুলো ইবাদাতের পরিবর্তে
গুনাহে রূপান্তারিত হয়ে যায়।
দু‘আয় সীমা অতিক্রম করা কয়েক প্রকারে হতে পারে–
১. দু‘আয় শাব্দিক লৌকিকতা, ছন্দ ইত্যাদি অবলম্বন করা, এতে বিনয় ও নম্রতা ব্যাহত
হয়।
২. দু‘আয় অনাবশ্যক শর্ত সংযুক্ত করা। যেমন- বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল
[রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] স্বীয় পুত্রকে এভাবে দু‘আ করতে দেখলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার
কাছে জান্নাতে শুভ্র রঙ্গের ডান দিকস্থ প্রাসাদ প্রার্থনা করি’। তিনি পুত্রকে বারণ
করে বললেন, ‘বৎস! তুমি আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাও। কেননা,
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি,
এমন কিছু লোক হবে যারা দু‘আ এবং পবিত্রতার মধ্যে সীমাতিক্রম করবে’। [আবু দাউদ ৯৬, অধ্যায়ঃ পবিত্রতা অর্জন; ইবন
মাজাহ ৩৮৬৪, অধ্যায়ঃ দু‘আ]
৩. সাধারণ মুসলিমদের জন্য বদ্দু‘আ করা কিংবা এমন কোন বিষয় কামনা করা যা সাধারণ
লোকের জন্য ক্ষতিকর এবং অনুরূপ এখানে উল্লেখিত দু‘আয় বিনা প্রয়োজনে আওয়াজ উচ্চ করাও
এক প্রকার সীমা অতিক্রম। [তাফসীর মাযহারী; আহকামুল কুরআন]
৪. এমন অসম্ভব বিষয় কামনা করা যা হবার নয়। যেমন- নবীদের মর্যাদা বা নবুওয়াত চাওয়া।

No comments