কুরআন পড়ে কোন লাভ হবে না, যদি...


ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
ওটা সেই বই যা-তে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, পথনির্দেশক (হুদা) মুত্তাক্বীদের জন্য।
[সূরা বাক্বারাহ-২, আয়াতঃ ২]

লক্ষ করুন, ‘যা-লিকা’ (ذٰلِكَ) শব্দ দিয়ে আল্লাহ সুব্‌হানাহু ওয়া তা‘আলা কুরআনকে ‘ওটা’ বলে সম্বোধন করেছেন, ‘এটা’ বলে নয়। এর সম্ভাব্য কারণ, আল্লাহ তা‘আলা এখানে ‘লাওহে মাহফুযে’ সংরক্ষিত সম্পূর্ণ কুরআনকে বুঝিয়েছেন। নবী মুহাম্মাদ যখন এই আয়াতটি অন্যদের তিলাওয়াত করে শুনাচ্ছিলেন, তখন তিনি যদি বলতেন, ‘এটা সেই বই’, তবে প্রশ্ন আসতো কোন বই? তাঁর সামনে তো কোন বই নেই! তাই ‘ওটা’ বলে দূরের কোন বইকে সম্বোধন করা হয়েছে। এ ছাড়াও ভাষাগতভাবে ذٰلِكَ (ওটা) ব্যবহার করা হয় কোন কিছুকে সম্মান প্রদর্শন করে নির্দেশ করার জন্য।

কুরআনের আগেও আসমানী কিতাব এসেছিলো, যেমন- তাওরাত এবং ইঞ্জিল। [সূরা ইমরান-৩, আয়াতঃ ৩] কুরআন সেগুলোর সত্যায়নকারী এবং সংরক্ষণকারী। অর্থাৎ, আগের কিতাবধারীরা তাদের বই বদলে ফেললেও কুরআন ঠিকই বলে দেবে সেখানে কি ছিল। [সূরা মায়িদাহ-৫, আয়াতঃ ৪৮]

অনেকের ধারণা ইসলাম একটি নতুন ধর্ম, যা মুহাম্মাদ প্রথম প্রচার করে গেছেন। এটি একটি ভুল ধারণা। ইসলাম হচ্ছে মহান আল্লাহ সুব্‌হানাহু ওয়া তা‘আলা নির্ধারিত সকল মানবজাতির জন্য একমাত্র ধর্ম, যার মূল নির্যাস তাওহীদ। তবে একেকজন নবীর ক্ষেত্রে আইন-কানুন এবং আদেশ-নিষেধ ছিল আলাদা। মুহাম্মাদ -কে শেষ নবী ও রাসূল হিসেবে পাঠানোর পরে তাকে যে শারী‘আহ দেয়া হয়েছিলো, তা মহান আল্লাহ সুব্‌হানাহু ওয়া তা‘আলার কাছে ‘লাওহে মাহফুযে’ সংরক্ষিত আছে। একেই ‘আল-কিতাব’ (الْكِتٰب) বলে সম্বোধন করা হয়। এই ‘আল-কিতাব’ থেকে দীর্ঘ ২৩ বছর যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু নাযিল হয়েছে। ওয়াহী নাযিলের সমাপ্তির পরে তা আমরা একটি বই আকারে পেয়েছি।

লা রইবা (لَا رَيْبَ) শব্দটি আরবীর বিশেষ ভাষারীতি একে বলেলা নাফিঈ জিন্’; অর্থাৎ নেই, সম্ভাবনাও নেই সাধারণ নেতিবাচকলা রইবুনমানে সন্দেহ নেই আর এখানে ব্যবহৃতলা রইবামানে বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহের অবকাশ নেই নেই! নেই! নেই! আরবী ভাষারীতিতে ‘এরাব’, যেমন- এখানেথেকেএর এই পরিবর্তন অর্থ যে কিভাবে বদলে দেয়, তা যারা আরবী জানে না তারা কল্পনাও করতে পারবে না

কুরআন কোন মেটাফিজিক্স বা ফিলোসফির বই নয় যে, এখানে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা মানুষের অনুমান এবং যুক্তির উপর নির্ভর করে নানা রকম তত্ত্ব দেওয়া আছে এবং যার ভূমিকাতে লেখক আগেভাগেই বলে দেন, ‘আমার কোন ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন’। কুরআন এমন একটি বই, যার লেখক শুধু এই পৃথিবীর কেউ নন; বরং তিনি মহাবিশ্বের সকল জ্ঞানের অধিকারী, মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা। তাঁর কথা অনেকাংশে আধুনিক বিজ্ঞান সত্যি প্রমাণ করেছে, আর কিছু নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। কিন্তু কুরআনে এমন কোন বাণী নেই, যেটা আধুনিক বিজ্ঞান সর্বসম্মতিক্রমে প্রমাণ করেছে যে তা ভুল এবং তা ভুল প্রমাণ করে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পেরেছে।

আধুনিক মানুষদের অনেকেরই ধর্মের অনেক কিছুই মানতে কষ্ট হয়। তারা সবকিছুতেই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খোঁজেন। যেটাই তাদের কাছে আজকের যুগের বিজ্ঞান অনুসারে ‘অবৈজ্ঞানিক’ মনে হয়, সেটাই তাদের মেনে নিতে কষ্ট হয় এবং সারা জীবন মনের মধ্যে একটা কাঁটা বিঁধে থাকে। সেক্ষেত্রে তারা প্রোবাবিলিটি (probability) ব্যবহার করে দেখতে পারেন। যদি কোন কিছুর ৭০-৮০% সম্পূর্ণ ১০০ ভাগ সত্য হয়, বাকি ২০-৩০% মিথ্যা না হয়, তাহলে সেই ২০-৩০% সত্য হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি সুতরাং কুরআনের ১০০% সত্য হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি এই ফর্মুলা কাজে লাগালে আশা করি কুরআনের যেসব ব্যাপার বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে মেনে নিতে পারছেন না, সেগুলোতে বিশ্বাস করতে সমস্যা হবে না

শুধু বিজ্ঞান নয়, কুরআনে তথ্যগত কোন ভুল নেই, ভাষাগত কোন ভুল নেইব্যাকরণ বলুন আর বানান কুরআনের কোন সম্পাদক বা সম্পাদনা পরিষদ নেই; কুরআনের সংস্করণ একটিই কুরআন পৃথিবীর একমাত্র বই, যা শুরু হয়েছে নির্ভুলতার চ্যালেঞ্জ দিয়ে এবং সেই দাবি আজও অম্লান আজকাল ইন্টারনেটে প্রচুর দেখা যায় কুরআনে ব্যাকরণগত ভুল আছে বা কুরআনে স্ববিরোধী আয়াত আছে ইত্যাদি দাবি করতে এইসব দাবি এক ধরনের প্রতারণা; এগুলোর প্রত্যেকটির যথাযথ জবাব আছে

মুত্তাক্বীন (مُتَّقِين) শব্দটির অর্থ সাধারণত করা হয়যারা আল্লাহ ভীরু যাদের তাক্বওয়া আছে, তাদের মুত্তাক্বী বলা হয় এবং তাক্বওয়াকে সাধারণতআল্লাহভীতিঅনুবাদ করা হয় এটি পুরোপুরি সঠিক অনুবাদ নয়; কারণ, ‘ভয়এর জন্য আরবীতে ভিন্ন শব্দ রয়েছে; যেমন- ‘খাওফ’ (خوف), ‘খাশিয়া’ (خشى), ‘হিযর’ (حذر)। শুধু কুরআনেই ১২টি আলাদা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন গভীরতার ভয়, সতর্কতা, আতঙ্ক ইত্যাদি তুলে ধরার জন্য এর মধ্যেতাক্বওয়াহচ্ছে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ব্যাপারে সমসময় পূর্ণ সচেতন থাকা এবং আল্লাহর অপছন্দের কাজ থেকে সর্বাত্মক বিরত থাকা

ধরুন, আপনি প্রতিদিন কি করেন, সেটা নিয়ে একটা রিয়্যালিটি টিভি শো বানানো হচ্ছে আপনার বাসার সবগুলো রুমে ক্যামেরা বসানো হয়েছে আপনি ঘুম থেকে উঠার পর ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সবসময় আপনার সাথে একজন ক্যামেরাম্যান আপনার দিকে ক্যামেরা তাক করে রেখেছে আপনি কি বলছেন, কি করছেন, কি খাচ্ছেন, কি দেখছেন, সবকিছু প্রতি মুহূর্তে রেকর্ড করা হচ্ছে কল্পনা করুন, যদি এ রকম কোন ঘটনা ঘটে, তাহলে আপনার মানসিক অবস্থা কি হবে? আপনি প্রতিটা কথা বলার আগে চিন্তা করবেন যে আপনার কথাগুলো মার্জিত হচ্ছে কি না, আপনার হাটার ধরণ ঠিক আছে কি না, আপনি উল্টোপাল্টা দিকে তাকালে সেটা আবার রেকর্ড হয়ে গেলো কি না আপনি টিভিতে যেসব হিন্দি সিরিয়াল, বিজ্ঞাপন, মুভি দেখেন, যেসব গান শোনেন, ইন্টারনেটে যেসব সাইট ঘুরে বেড়ান, সেগুলো ক্যামেরায় রেকর্ড হয়ে গেলে লোকজনের কাছে মান-সম্মান থাকবে কি না এই যে ক্যামেরাম্যানের প্রতি আপনার চরম সচেতনতা, আল্লাহর প্রতি আপনার ঠিক একই ধরনেরতাক্বওয়াথাকার কথা

আপনার দিকে একজন ক্যামেরাম্যান নয়, বরং কমপক্ষে দুইজন অদৃশ্য সত্তা প্রতি মুহূর্তে এমন এক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনার প্রতিটা চিন্তা, কথা, কাজ রেকর্ড করছেন, যার ধারে-কাছে কিছু কোন দিন মানুষ বানাতে পারবে না আর সেটা যদি আপনার সাবধান হওয়ার জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে মনে রাখুন

এমন একজন প্রচণ্ড ক্ষমতাধর সত্ত্বা সবসময় আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন, যিনি সেই অদৃশ্য সত্ত্বাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদের সেই অভাবনীয় প্রযুক্তি দিয়েছেন এই মহা ক্ষমতাশীল সত্ত্বা মানুষের থেকেও অনেক অনেক বেশি ক্ষমতাধর বুদ্ধিমান সত্ত্বাদের সৃষ্টি করেছেন; যারা আলোর গতিবেগ অতিক্রম করে এক মুহূর্তের মধ্যে মহাবিশ্বের যে কোন জায়গায় চলে যেতে পারে এই পুরো মহাবিশ্ব তাঁর হাতের মুঠোয় আপনি তাঁকে কোনভাবেই এক মুহূর্তের জন্যও ফাঁকি দিতে পারবেন না

এই আয়াতটির অর্থে একটি লক্ষ্য করার মত ব্যাপার রয়েছেকুরআন সবার জন্য পথপ্রদর্শক নয় এটি পথপ্রদর্শক শুধু তাদের জন্য, যারা সৃষ্টিকর্তার প্রতি অত্যন্ত সচেতন এর মানে কি? সবাই কি তাহলে কুরআন পড়ে সঠিক পথ পাবে না? তাহলে কুরআন পাঠিয়ে কি লাভ হলো? পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ অমুসলিম আছে, যারা কুরআন পড়ে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নামধারী মানুষও কুরআন পড়ে কিন্তু কুরআন পড়েও তারা নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারেনি তারা আগেও যেরকম ছিল, এখনো সেরকমই রয়ে গেছে তারা আগেও মিথ্যা বলতো, এখনো বলে তারা আগেও সিগারেট খেতো, এখনো খায় তারা আগেও অর্ধেক শরীর বের করে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতো, এখনো করে এর কারণ কি?

এর কারণতাদের তাক্বওয়ার অভাব। কুরআন পড়ে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনে পরিবর্তন আনতে হলে, প্রথমে আপনার ভেতরে সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর সচেতনতা তৈরি করতে হবে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা অনুভব করতে হবে। [তাফহিমুল কুরআন] আপনাকে মানতে হবে যে, আপনি একজন মহান রবের মামুলি দাসমাত্র। তিনি আপনাকে প্রতি মুহূর্তে দেখছেন, আপনার প্রত্যেকটা কথা, কাজ, চিন্তা রেকর্ড করছেন। সঠিক পথ পাওয়ার জন্য তিনি আপনাকে অসাধারণ এক ‘ম্যানুয়াল’ (manual) দিয়েছেন। আপনাকে তিনি এক বিরাট সৌভাগ্য দিয়েছেন, যা পৃথিবীতে অনেক মানুষকে দেননি

আপনি যখন এই অনুভূতি, এইতাক্বওয়ানিয়ে কুরআন পড়বেন; শুধু তখনই আপনি কুরআন পড়ে নিজের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারবেন কুরআন তখন আপনার জন্য হুদা’ (পথপ্রদর্শক) হিসেবে কাজ করবে যদি সেইতাক্বওয়ানা থাকে, তাহলে আপনি কুরআন পড়বেন, কিন্তু ভুল বুঝবেন ধার্মিক মানুষদের অপদস্থ করার জন্য কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা করবেন মুসলিম দল বা ব্যক্তির মিথ্যা দোষ ধরবেন, প্রচার করবেন কুরআন পড়ে আপনার ভেতরে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না কুরআন আপনার জন্য পথপ্রদর্শক হবে না, বরং অমূলক দার্শনিক যুক্তিতর্ক করে বিকৃত আনন্দ পাওয়ার একটি উৎস হবে

কুরআন পড়ে তা থেকে কোন ধরনের উপকার পাওয়ার প্রথম শর্ততাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) সেই তাক্বওয়া যাদের মধ্যে আছে, তাদের বলা হয়মুত্তাক্বী

বইঃ পড়ো òò লেখকঃ ওমর আল জাবির

No comments

Theme images by Blogger. Powered by Blogger.