আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদেরকে পর্দার নির্দেশ



وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ اِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ اَوْ آبَائِهِنَّ اَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ اَوْ اَبْنَائِهِنَّ اَوْ اَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ اَوْ اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِي اِخْوَانِهِنَّ اَوْ بَنِي اَخَوَاتِهِنَّ اَوْ نِسَائِهِنَّ اَوْ مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُنَّ اَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ اُولِي الْاِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِاَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا اِلَى اللَّهِ جَمِيعًا اَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

“আর মু‘মিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না[১]। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত রাখে[২]। আর তারা (নারীরা) যেন[৩] তাদের স্বামী,[৪] পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা (ভাই), ভ্রাতুষ্পুত্র (ভাইয়ের ছেলে), ভাগিনী পুত্র (বোনের ছেলে),[৫] তাদের (নিজেদের) নারীগণ,[৬] তাদের মালিকানাধীন দাসী,[৭] যৌনকামনা-রহিত পুরুষ[৮] এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক[৯] ছাড়া কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে; আর তারা যে তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে[১০]। হে মু‘মিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো”[১১]
[সূরা নূর-২৪, আয়াতঃ ৩১]

অভিধানে زِينَت এমন বস্তুকে বলা হয়, যা দ্বারা মানুষ নিজেকে সুসজ্জিত ও সুদৃশ্য করে। এটা উৎকৃষ্ট বস্তুও হতে পারে এবং অলঙ্কারও হতে পারে। এসব বস্তু যদি কোন নারীর দেহে না থেকে পৃথকভাবে থাকে, তবে সর্বসম্মতিক্রমে এগুলো দেখা পুরুষদের জন্য হালাল। যেমন- বাজারে বিক্রির জন্য মেয়েলী পোশাক ও অলঙ্কার ইত্যাদি দেখায় কোন দোষ নেই। তাই অধিকাংশ তাফসীরবিদ আলোচ্য আয়াতে زِينَت-এর অর্থ নিয়েছেন সাজ-সজ্জার স্থান। অর্থাৎ যেসব অঙ্গে সাজ-সজ্জার অলঙ্কার ইত্যাদি পরিধান করা হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, সাজ-সজ্জার স্থানসমূহ প্রকাশ না করা নারীদের উপর ওয়াজিব। আয়াতের পরবর্তী অংশে নারীর এই বিধান থেকে দু’টি ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হয়েছে, (১) যার প্রতি দেখা হয়, তার হিসেবে এবং (২) যে দেখে, তার হিসেবে। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা  ৫১৭]

[১] প্রথম ব্যতিক্রম হচ্ছে, مَا ظَهَرَ مِنْهَا অর্থাৎ নারীর কোন সাজ-সজ্জার অঙ্গ পুরুষের সামনে প্রকাশ করা বৈধ নয়, অবশ্য সেসব অঙ্গ ব্যতীত যেগুলো আপনা-আপনি প্রকাশ হয়েই পড়ে। অর্থাৎ কাজকর্ম ও চলাফেরার সময় যেসব অঙ্গ স্বভাবত খুলেই যায়, এগুলো ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত; এগুলো প্রকাশ করার মধ্যে কোন গুনাহ নেই। [ইবনু কাসীর] এতে কোন্‌ কোন্‌ অঙ্গ বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে ইবনু মাসঊদ ও ইবনু আব্বাস [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু]-এর তাফসীর বিভিন্ন রূপ। ইবনু মাসঊদ [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, مَا ظَهَرَ مِنْهَا বাক্যে উপরের কাপড় যেমন- বোরকা, লম্বা চাদর ইত্যাদিকে ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো সাজ-সজ্জার পোশাককে আবৃত রাখার জন্য পরিধান করা হয়। আয়াতের অর্থ এই যে, প্রয়োজনবশত বাইরে যাওয়ার সময় যেসব উপরের কাপড় আবৃত করা সম্ভবপর নয়, সেগুলো ব্যতীত সাজ-সজ্জার কোন বস্তু প্রকাশ করা জায়েজ নয়। ইবনু আব্বাস [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, ‘এখানে মুখমণ্ডল ও হাতের তালু বোঝানো হয়েছে’। কেননা, কোন নারী প্রয়োজনবশত বাইরে যেতে বাধ্য হলে, কিংবা চলাফেরা ও লেনদেনের সময় মুখমণ্ডল ও হাতের তালু আবৃত রাখা খুবই দুরূহ হয়। অতএব ইবনু মাসঊদের তাফসীর অনুযায়ী নারীর জন্য বেগানা পুরুষের সামনে মুখমণ্ডল ও হাতের তালু খোলাও জায়েজ নয়। শুধু উপরের কাপড়, বোরকা ইত্যাদি প্রয়োজনবশত খুলতে পারে। পক্ষান্তরে ইবনু আব্বাসের তাফসীর অনুযায়ী মুখমণ্ডল ও হাতের তালুও বেগানা পুরুষদের সামনে প্রকাশ করা জায়েজ। এ কারণে ফিকাহবিদগণের মধ্যেও এ ব্যাপারে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ প্রশ্নে সবাই একমত যে, মুখমণ্ডল ও হাতের তালুর প্রতি দৃষ্টিপাত করার কারণে যদি অনর্থ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে এগুলো দেখাও জায়েজ নয় এবং নারীদের জন্য এগুলো প্রকাশ করাও জায়েজ নয়। কাযী বায়যাবী ও খাযিন [রাহিমাহুল্লাহ] এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, নারীর আসল বিধান এই যে– সে তার সাজ-সজ্জার কোন কিছু প্রকাশ করবে না; আর আয়াতের উদ্দেশ্যও তাই মনে হয়। তবে চলাফেরা ও কাজকর্মে স্বভাবত যেগুলো খুলে যায়, সেগুলো প্রকাশ করতে পারবে। বোরকা, চাদর, মুখমণ্ডল ও হাতের তালু এগুলোর অন্তর্ভুক্ত। নারী কোন প্রয়োজনে বাইরে বের হলে বোরকা, চাদর ইত্যাদি প্রকাশ হয়ে পড়া সুনির্দিষ্ট। লেনদেনের প্রয়োজনে কোন সময় মুখমণ্ডল ও হাতের তালুও প্রকাশ হয়ে পড়ে; এটাও ক্ষমার্হ, গুনাহ নয়। কিন্তু এই আয়াত থেকে কোথাও প্রমাণিত হয় না যে, বিনা প্রয়োজনে নারীর মুখমণ্ডল ও হাতের তালু দেখাও পুরুষদের জন্য জায়েয; বরং পুরুষদের জন্য দৃষ্টি নত রাখার বিধানই প্রযোজ্য। যদি নারী কোথাও মুখমণ্ডল ও হাত খুলতে বাধ্য হয়, তবে শরীয়তসম্মত ওজর ও প্রয়োজন ব্যতীত তার দিকে না দেখা পুরুষদের জন্য অপরিহার্য। এই ব্যাখ্যায় পূর্বোল্লিখিত উভয় তাফসীরই স্থান পেয়েছে। ইমাম মালিক [রাহিমাহুল্লাহ]-এর প্রসিদ্ধ মতও এই যে, বেগানা নারীর মুখমণ্ডল ও হাতের তালু দেখাও বিনা প্রয়োজনে জায়েজ নয়। ‘যাওয়াজির’ গ্রন্থে ইবনু হাজার আসকালানী, ইমাম শাফেয়ী [রাহিমাহুল্লাহ] একই মত পোষণ করেছেন। নারীর মুখমণ্ডল ও হাতের তালু গোপন অঙ্গের অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো খোলা অবস্থায়ও স্বালাত/নামায হয়ে যায়, কিন্তু বেগানা পুরুষদের জন্য এগুলো দেখা শরীয়তসম্মত প্রয়োজন ব্যতিরেকে জায়েজ নয়। বলা বাহুল্য, মানুষের মুখমণ্ডলই সৌন্দর্য ও শোভার আসল কেন্দ্রস্থল। বলা হয়, Beauty is the capital of Face অর্থাৎ সৌন্দর্যই মুখমণ্ডলের রাজধানী’। এটা অনর্থ, ফ্যাসাদ, কামাধিক্য ও গাফেলতির যুগ। তাই বিশেষ প্রয়োজন যেমন- চিকিৎসা অথবা তীব্র বিপদাশঙ্কা ছাড়া বেগানা পুরুষদের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখমণ্ডল খোলা নারীর জন্য নিষিদ্ধ এবং তার দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টিপাত করাও বিনা প্রয়োজনে পুরুষদের জন্য জায়েজ নয়। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৭-৫১৮]

[২] আলোচ্য আয়াতে বাহ্যিক সাজ-সজ্জার ব্যতিক্রম বর্ণনা করার পর ইরশাদ হচ্ছে, وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ অর্থাৎ “তারা যেন তাদের বক্ষদেশে ওড়না ফেলে রাখে”। خُمُرٌ শব্দটি خِمَارٌ-এর বহুবচন। এর অর্থ জামার কলার। প্রাচীন কাল থেকে জামার কলার বক্ষদেশে থাকাই প্রচলিত। তাই জামার কলার আবৃত করার অর্থ বক্ষদেশ আবৃত করা। আয়াতের শুরুতে সাজ-সজ্জা প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই বাক্যে সাজসজ্জা গোপন রাখার তাকীদ এবং এর একটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে। এর আসল কারণ, মূর্খতার যুগের একটি প্রথার বিলোপ সাধন করা। মূর্খতার যুগে নারীরা ওড়না মাথার উপর রেখে তার দুই প্রান্ত পৃষ্ঠদেশে ফেলে রাখতো। ফলে তাদের গলা, বক্ষদেশ ও কান অনাবৃত থাকতো। তাই মুসলমান নারীদেরকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন এরূপ না করে, বরং ওড়নার উভয় প্রান্ত পরস্পর উল্টিয়ে রাখে; এতে সকল অঙ্গ আবৃত হয়ে পড়ে। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮]

[৩] এখানে সেই সৌন্দর্য বা প্রসাধন এগানা পুরুষদের সামনে প্রকাশ করা বৈধ বলা হচ্ছে, যা ইতিপূর্বে বেগানা পুরুষদের সামনে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। অর্থাৎ, পোশাক, অলংকার ও প্রসাধন ইত্যাদির সৌন্দর্য যা চাদর বা বোরকার নিচে গুপ্ত থাকে। এখানে এ মর্মে ব্যতিক্রমধর্মী বর্ণনা এসেছে যে, অমুক অমুক ব্যক্তির সামনে প্রকাশ করা বৈধ হবে। [আহসানুল বায়ান-pdf, পৃষ্ঠা ৬১৮]

[৪] দ্বিতীয় ব্যতিক্রম এমন পুরুষদের বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের কাছে শরীয়তে পর্দা নেই। এই পর্দা না থাকার কারণ দু’রকম, যথা- (১) যেসব পুরুষকে ব্যতিক্রমভুক্ত করা হয়েছে, তাদের তরফ থেকে কোন অনর্থের আশঙ্কা নেই; আর তারা মাহরাম। আল্লাহ তা‘আলা তাদের স্বভাবকে দৃষ্টিগতভাবে এমন করেছেন, তারা এসব নারীর সতীত্ব সংরক্ষণ করে এবং তাদের পক্ষ থেকে কোন অনর্থের সম্ভাবনা নেই। (২) সদাসর্বদা এক জায়গায় বসবাস করার প্রয়োজনেও মানুষ পরস্পরে সহজ ও সরল হয়ে থাকে। তবে হ্যা, স্বামী ব্যতীত অন্যান্য মাহরামকে যে ব্যতিক্রমভুক্ত করা হয়েছে, এটা পর্দার বিধান থেকে ব্যতিক্রম; গোপন অঙ্গ আবৃত রাখা থেকে ব্যতিক্রম নয়। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৮]

এদের মধ্যে সবার শীর্ষে হল স্বামী; সেই জন্য স্বামীকে সবার আগে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ স্ত্রীর সকল শোভা-সৌন্দর্য একমাত্র স্বামীর জন্যই নির্দিষ্ট। আর স্বামীর জন্য স্ত্রীর সারা দেহ (দেখা ও ছোঁয়া) বৈধ; যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “স্বামী-স্ত্রী একে অপরের লেবাস”। [সূরা বাক্বারাহ-২, আয়াতঃ ১৮৭] এছাড়া মাহরাম (অর্থাৎ এগানা; যাদের সঙ্গে চিরতরে বিবাহ হারাম) অথবা ঘরে যাদের আসা-যাওয়া সব সময় হয়ে থাকে এবং নৈকট্য বা আত্মীয়তার কারণে বা অন্য কোন প্রাকৃতিক কারণে নারীর প্রতি তাদের সকাম এমন আকর্ষণ সৃষ্টি হয় না; যার ফলে কোন ফিত্‌না (বা অঘটন) ঘটার আশঙ্কা থাকে, শরীয়তে সেই সমস্ত লোকদের সামনে এবং এগানা পুরুষদের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে মামা ও চাচার কথা উল্লেখ হয়নি। অধিকাংশ উলামাগণের নিকট এরাও মাহরাম বা এগানার অন্তর্ভুক্ত। এদের সামনেও সৌন্দর্য প্রদর্শন মহিলার জন্য বৈধ। পক্ষান্তরে কিছু উলামার নিকট এরা মাহরামের অন্তর্ভুক্ত নয়। [ফাতহুল ক্বাদীর]

[৫] পিতা বলতে বাপ, দাদা, দাদার বাপ এবং তার ঊর্ধ্বে, নানা ও নানার বাপ এবং তার ঊর্ধ্বের সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ শ্বশুর বলতে শ্বশুরের বাপ, দাদা এবং তার ঊর্ধ্বে সকলেই শামিল। পুত্র বলতে বেটা, পোতা, পোতার বেটা, নাতী নাতীর বেটা এবং এদের নিম্নের সকলেই শামিল। স্বামীর পুত্র বলতেও তার (অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত) বেটা, পোতা এবং তার নিম্নের সকলেই শামিল। ভ্রাতা বলতে সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় তিন প্রকারের ভাইকেই বুঝানো হয়েছে। ভ্রাতুষ্পুত্র বলতে ভাইপো বা ভাতিজা ও তাদের নিম্নের সকল পুরুষকে এবং ভাগিনী পুত্র বলতে সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় তিন প্রকার বোনের বেটা (ভাগ্নে) ও তাদের নিম্নের সকল পুরুষকে বুঝানো হয়েছে। [আহসানুল বায়ান-pdf, পৃষ্ঠা ৬১৯]

[৬] আয়াতে نِسَائِهِنَّ অর্থাৎ ‘তাদের (নিজেদের) নারীগণ’ বলতে মুসলিম মহিলাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে যে, তারা যেন কোন মহিলার শোভা-সৌন্দর্য, রূপ-লাবণ্য, দৈহিক আকার-আকৃতি নিজেদের স্বামীর কাছে বর্ণনা না করে। এছাড়া যে কোন কাফির মহিলার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা নিষেধ। এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন ঊমার ও আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু], মুজাহিদ ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল [রাহিমাহুল্লাহ]। কেউ কেউ বলেন, এখানে ‘তাদের নারীগণ’ বলতে বিশেষ ধরনের নারীদেরকে বুঝানো হয়েছে, যারা খিদমত ইত্যাদির জন্য সর্বদা কাছে থাকে, আর তার মধ্যে বাঁদী-দাসীও শামিল; এদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করায় দোষ নেই। [আহসানুল বায়ান-pdf, পৃষ্ঠা ৬১৯]

[৭] اَوْ مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُنَّ অর্থাৎ “যারা নারীদের মালিকানাধীন”। এতে দাস-দাসী উভয়েই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ফিকহবিদগণের মতে এখানে শুধু দাসী বোঝানো হয়েছে। পুরুষ দাস এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের কাছে সাধারণ মাহরামের ন্যায় পর্দা করা ওয়াজিব। সাঈদ ইবনু মুসায়্যিব [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] তাঁর সর্বশেষ উক্তিতে বলেন, ‘তোমরা সূরা নূরের আয়াতদৃষ্টে বিভ্রান্ত হয়ো না যে, مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُنَّ বাক্যাংশে দাসরাও শামিল রয়েছে। এই আয়াতে শুধু দাসীদেরকে বোঝানো হয়েছে; পুরুষ দাস এর অন্তর্ভুক্ত নয়’। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৯]

مَا مَلَكَتْ اَيْمَانُهُنَّ অর্থাৎ “তাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে” বলতে কেউ কেউ শুধু ক্রীতদাসী এবং কেউ কেউ শুধুমাত্র ক্রীতদাস অর্থ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ উভয়কেই বুঝিয়েছেন। হাদীসে এসেছে যে, ক্রীতদাসদের সামনে পর্দার প্রয়োজন নেই। [আবূ দাঊদ ৪১০৬, অধ্যায়ঃ পোশাক-পরিচ্ছদ] অনুরূপ কেউ কেউ তা ব্যাপক অর্থ নিয়ে বলেছেন, তাতে মু‘মিন ও কাফির উভয় প্রকার ক্রীতদাস শামিল। [আহসানুল বায়ান-pdf, পৃষ্ঠা ৬১৯]

[৮] اَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ اُولِي الْاِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ ইবনু আব্বাস [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, এখানে এমন নির্বোধ ও ইন্দ্রিয়বিকল ধরনের লোক বোঝানো হয়েছে, যাদের নারীজাতির প্রতি কোন আগ্রহ ও ঔৎসুক্যই নেই। [ইবনু কাসীর] ইবনু জারীর ত্বাবারী [রাহিমাহুল্লাহ] এই বিষয়বস্তুই আবূ আব্দুল্লাহ, ইবনু জুবাইর, ইবনু আতিয়্যাহ প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেছেন। কাজেই আয়াতে এমন সব পুরুষকে বোঝানো হয়েছে, যাদের মধ্যে নারীদের প্রতি কোন আগ্রহ ও কামভাব নেই এবং তাদের রূপ-গুণের প্রতিও কোন ঔৎসুক্য নেই যে, অপরের কাছে গিয়ে বর্ণনা করবে। তবে নপুংসক ধরনের লোক, যারা নারীদের বিশেষ গুণাবলীর সাথে সম্পর্ক রাখে, তাদের কাছেও পর্দা করা ওয়াজিব। আয়িশাহ [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা]-এর হাদীসে আছে, জনৈক নপুংসক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে যাওয়া-আসা করতো। স্ত্রীগণ তাদেরকে আয়াতে বর্ণিত غَيْرِ اُولِي الْاِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ অর্থাৎ ‘পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন-কামনা সম্পন্ন নয়’-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করে তাদের সামনে আগমন করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন উক্ত ব্যক্তিকে গৃহে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিলেন। এ কারণেই ইবনু হাজার আসকালানী [রাহিমাহুল্লাহ] ‘মিনহাজ’ গ্রন্থের টীকায় বলেন, পুরুষ যদিও পুরুষত্বহীন, লিঙ্গকর্তিত অথবা খুব বেশি বৃদ্ধ হয়, তবুও সে غَيْرِ اُولِي الْاِرْبَةِ শব্দের অন্তর্ভুক্ত নয়; তার কাছে পর্দা করা ওয়াজিব। এখানে غَيْرِ اُولِي الْاِرْبَةِ শব্দের সাথে التَّابِعِينَ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য এই যে, নির্বোধ ইন্দ্রিয়বিকল লোক, যারা অনাহূত মেহমান হয়ে খাওয়া-দাওয়ার জন্য গৃহে ঢুকে পড়ে, তারা ব্যতিক্রমভুক্ত। এ কথা উল্লেখ করার একমাত্র কারণ এই যে, তখন এমনি ধরনের কিছু নির্বোধ লোক বিদ্যমান ছিল। তারা অনাহূত হয়ে খাওয়া-দাওয়ার জন্য গৃহের মধ্যে প্রবেশ করতো। এখানে বিধানের আসল ভিত্তি নির্বোধ ও ইন্দ্রিয়বিকল হওয়ার উপর; অনাহূত মেহমান হওয়ার উপর নয়। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫১৯]

কেউ কেউ এ থেকে এমন সব পুরুষ অর্থ নিয়েছেন, যাদের ঘরে থেকে খাওয়া-পান করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে না। আবার কেউ নির্বোধ, কেউ হিজড়া, খাৎনা করা বা ধ্বজভঙ্গ, কেউ অতিবৃদ্ধ অর্থ নিয়েছেন। ইমাম শাওকানী [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, যাদের মধ্যে কুরআনে বর্ণিত গুণ পাওয়া যাবে, তারা এর পর্যায়ভুক্ত এবং অন্যেরা বহির্ভূত হবে। [আহসানুল বায়ান-pdf, পৃষ্ঠা ৬১৯]

[৯] اَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ এখানে এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালককে বোঝানো হয়েছে, যে এখনও সাবালকত্বের নিকটবর্তী হয়নি এবং নারীদের বিশেষ আকর্ষণ, কমনীয়তা ও গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর। যে বালক এসব অবস্থা সম্পর্কে সচেতন, সে ‘মুরাহিক’ অর্থাৎ সাবালকত্বের নিকটবর্তী; তার কাছে পর্দা করা ওয়াজিব। [ইবনু কাসীর] ইমাম জাস্‌সাস [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন, এখানে طِفْل বলে এমন বালককে বোঝানো হয়েছে, যে বিশেষ কাজ-কারবারের দিক দিয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য বুঝে না। এ পর্যন্ত পর্দা থেকে ব্যতিক্রমভুক্তদের বর্ণনা সমাপ্ত হলো। [তাফসীর জালালাইন (বাংলা অনুবাদ-pdf), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২০]

[১০] গোপন আভরণ বা অলঙ্কার প্রকাশ পেয়ে অর্থাৎ, পায়ের নূপুরের শব্দে পুরুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট না হয়। হাই-হিল বা এমন শক্ত জুতা-চপ্পলও এই নির্দেশের শামিল। যেহেতু নারীরা যখন এসব পরিধান করে চলাফেরা করে, তখন তাতে এক ধরনের এমন শব্দ সৃষ্টি হয়, যা আকর্ষণে নূপুরের শব্দের তুলনায় কম নয়। অনুরূপ হাদীসে এসেছে যে, “সুগন্ধি মেখে ঘর থেকে বের হওয়া নারীদের জন্য বৈধ নয়। যে এ রকম করে, সে ব্যভিচারিণী”। [তিরমিযী ২৭৮৬, অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার; আবূ দাঊদ ৪১৭৩, অধ্যায়ঃ চুল আঁচড়ানো]

[১১] এখানে পর্দার আদেশের পরপর তাওবার আদেশ দেওয়ার মধ্যে যুক্তি হল যে, অজ্ঞতার যুগে এই সমস্ত আদেশের যে বিরোধিতা তোমরা করতে তা যেহেতু ইসলাম আসার পূর্বের কথা; সেহেতু তোমরা যদি সত্য অন্তরে তাওবাহ করে নাও এবং উক্ত আদেশের সঠিক বাস্তবায়ন কর, তাহলে সফলতা, ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য একমাত্র তোমাদের। [আহসানুল বায়ান-pdf, পৃষ্ঠা ৬১৯]

No comments

Theme images by Blogger. Powered by Blogger.