তাঁর মতো আর কেউ নেই (পর্ব-১)
সূরা ইখলাসে সৃষ্টিকর্তার মূল
ধারণাকে মাত্র চারটি বাক্যে প্রকাশ করা হয়েছে। সূরা ইখলাসের প্রতিটি শব্দের
গভীরতা, যৌক্তিকতা এবং প্রভাব নিয়ে এক একটি রিসার্চ পেপার লেখা যাবে।
আয়াতঃ ১
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
বলো, তিনিই
আল্লাহ, অদ্বিতীয়!
‘ক্বুল’ (قُلْ) (গলার ভেতর থেকে উচ্চারিত) অর্থ
‘বলো’। সাবধান থাকবেন, শুধু ‘কুল’ (كُلْ) অর্থ কিন্তু ‘খাও’। স্বলাতে/নামাযে সূরা
ইখলাস পড়ার সময় ভুলে বলবেন না, ‘কুল’ (كُلْ) অর্থাৎ ‘খাও’। তিনি আল্লাহ, অদ্বিতীয়!
এখন, কেন আল্লাহ সুব্হানাহু ওয়া
তা‘আলা শুরু করলেন ‘বলো’ দিয়ে? কেন তিনি শুধু বললেন না, ‘তিনি আল্লাহ, অদ্বিতীয়?’
আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি কে?’, আপনি কি তার উত্তরে বলবেন, ‘বলো, আমি
জাবির একজন মানুষ?’ নিশ্চয়ই না। তাহলে প্রশ্ন আসে, কেন ‘বলো’ দিয়ে শুরু হলো?
মানুষ যখন এসে নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর
সাথে ইসলাম নিয়ে কথা বলতো, তারা প্রায়ই প্রশ্ন করতো, ‘আল্লাহ কে? তাঁর বংশপরিচয়
কি?[১] তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো কি কি?’ [তাফসীর আত-ত্বাবারী ২৬/৪৮৫; আল
কামেল-ইবনে আদী ৫/২৬২; বায়হাকি-আল আসমা ওয়াস সিফাত ২/৩৮]
[১] আবূল আলিয়া
থেকে বর্ণিত, উবাই বিন কা‘ব [রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু] বলেন, “একদিন মুশরিকরা রাসূল ﷺ-এর
কাছে আল্লাহর বংশপরিচয় জানতে চেয়েছিলো”। [মুসনাদে আহমাদ ২১২১৯; তিরমিযী ৩৩৬৪]
এই সময়গুলোতে স্বয়ং আল্লাহ সুব্হানাহু
ওয়া তা‘আলা নবী ﷺ-এর মুখ দিয়ে
বলিয়েছিলেন, ‘বলো, তিনিই আল্লাহ, অদ্বিতীয়! অমুখাপেক্ষী, সবকিছু তাঁর উপর নির্ভরশীল।
তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ আর কিছুই নেই!’
সূরা ইখলাসে তাওহীদের ব্যাপারটি
এত স্পষ্ট এসেছে যে, একে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ
ﷺ সাহাবাগণকে
জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
‘তোমরা কি এক রাতে এক-তৃতীয়াংশ কুরআন পড়তে পারো?’ প্রস্তাবটি
তাদের কাছে ভারী মনে হলো। তাঁরা উত্তর দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এ কাজ আমাদের
মধ্যে কে করতে পারবে?’ তিনি (ﷺ)
বললেন, ‘ক্বুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ, আল্লা-হুস সামাদ’ অর্থাৎ সূরা ইখলাস কুরআনের
এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য’। [বুখারী ৫০১৫, অধ্যায়ঃ কুরআনের ফযীলত, পরিচ্ছেদঃ
৬৬/১৩]
এবার আসি দ্বিতীয় শব্দে– ‘হুওয়া’ (هُوَ) অর্থাৎ ‘তিনি’। কেন আয়াতটি শুধুই
‘বলো, আল্লাহ অদ্বিতীয়’ হলো না? কেন এখানে ‘তিনি’ যোগ করা হলো?
যখন নবী ﷺ-কে
খৃষ্টান, ইয়াহুদী, মুশরিকরা আল্লাহর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলো, আল্লাহ সুব্হানাহু
ওয়া তা‘আলা তাদের উত্তরে বলেছেন যে, তিনি কোন নতুন উপাস্য বা মা‘বূদ নন। ইসলাম কোন
নতুন ধর্ম নয় যে, এখানে কোন এক নতুন উপাস্য-এর ধারণা দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ
ধর্মগুলোতে নতুন নতুন উপাস্য নিয়ে আসে। কিছু ধর্ম বিকট আকৃতির অনেকগুলো হাত-পাসহ
এক মানুষরূপী মূর্তিকে উপাস্য বলে দাবি করে। কোন ধর্ম কোন এক দাড়িওয়ালা বয়স্ক
ভদ্রলোককে উপাস্য বলে দাবি করে। আবার কেউ বলছে, ‘ইলাহ’ হচ্ছেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ
মানুষ। কিন্তু সমগ্র সৃষ্টজগতের একমাত্র উপাস্য যে এক, তিনি যে আল্লাহ; সেটাই
এখানে ‘তিনি’ ব্যবহার করে জোর দেওয়া হয়েছে। ইয়াহুদী, খৃষ্টান, আরব মুশরিকরা যেই
সর্বোচ্চ ‘প্রভু’-কে ইতিমধ্যেই ‘এল্লাহি’, ‘এলোহিম’ ইত্যাদি বলে জানতো, ইসলাম
তাঁকেই একমাত্র মা‘বুদ হিসেবে দাবি করে।
আপনি যদি আফ্রিকার আদিবাসী জুলু
সম্প্রদায়ের কাউকে জিজ্ঞেস করেন, তাদের সৃষ্টিকর্তা ‘মভেলিংকাংগি’ কে? সে
বলবে–
“হাউ
উম্নিমযানি! উয়েনা, উময়া, অইংগসওয়েলে। আকাযালি ইয়েনা, ফুতহি আকাযালওয়াগ্না; ফুতহি,
আকুখো লুতমো অলু ফানা নায়ে! অর্থাৎ, তিনি পবিত্র এবং পরমাত্মা। তিনি কাউকে জন্ম
দেননা, কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তাঁর মতো আর কিছুই নেই”। [Callaway, H. (1970). The
religious system of the Amazulu.]
ঋগ্বেদের একটি বিখ্যাত শ্লোক, ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ অর্থাৎ উপাস্য মাত্র একজনই,
দ্বিতীয় কেউ নেই। [সনাতন ভাবনা ও সংস্কৃতি-
ঈশ্বর ও দেবতাঃ (n.d) Retrieved February 14, 2016, from http://sonatonvabona.blogspot.com/2013/12/blog-post_6.html] বাইবেলেও
আছে, “আমিই ঈশ্বর, আর কেহ নয়;
আমি ঈশ্বর; আমার তুল্য কেহ নাই”। [যিশাইয়-৪৬: ৯]
এ মিলগুলো থেকে বোঝা যায়, ইসলামে উপাস্য সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা ছিটে-ফোঁটা হিসেবে হলেও অন্যান্য কিছু ধর্মে থেকে গেছে। তবে সেখানে বিকৃতির তোড়ে সত্যের মধ্যে অনেক
মিথ্যা মিশে আছে।
‘আল্লাহ’ (اللّٰهُ) শব্দটি দিয়ে আল্লাহ সুব্হানাহু ওয়া তা‘আলা ঘোষণা দিলেন যে, তাঁর নাম হচ্ছে ‘আল্লাহ’। মক্কাতে
ইসলাম প্রচারের সময় মুসলিমরা প্রথম এই নামের প্রচলন করেছেন এমনটিও নয়, মুশরিকরা আগে থেকেই তাদের প্রধান ‘ইলাহ’-কে আল্লাহ নামে ডাকতো। এমনকি আবরীভাষী
খৃষ্টান এবং ইয়াহুদীরাও তাদের সর্বোচ্চ উপাস্যকে ‘আল্লাহ’ বলেই ডাকে।
এই আয়াতের শেষ শব্দটি হচ্ছে ‘আহাদ’ (اَحَد), যা এক অসাধারণ শব্দ। মানুষ যতই কল্পনা করুন না কেন, তারা কখনোই এক বলতে এমন কিছু কল্পনা করতে পারবে না, যা
পরম অসীম ‘এক’; যাকে কোন ছোট ভাগে ভাগ করা
যায় না, যার কোন তুলনা হয় না, যা
‘অদ্বিতীয়’। এই শব্দটা
শুধু আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কারণ, কাজ এবং গুণে
একমাত্র তিনিই পরিপূর্ণ সত্ত্বা। [তাফসীর ইবনু
কাসীর]
বইঃ পড়ো òò লেখকঃ
ওমর আল জাবির

No comments